Saturday, November 17, 2018

Atmotripti আত্মতৃপ্তি_Short Film stories

Atmotripti আত্মতৃপ্তি_Short Film stories ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে বের হয়েছিলাম দশটার পর। ওখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণ নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা। বড় মামার বড় ছেলে কামরুল ভাই এখানে থাকেন। কামরুল ভাই প্রশাসনিক ভবনের সেকশন অফিসার। অফিস থেকে কোনো বাসা পান নি, তাই এখানে ভাড়া থাকেন। দাদুকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে কামরুল ভাই’র বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাই। দাদুর সাথে আমি আর মা এসেছি। আমি বাইরে এলে দাদুর পাশে মা ছাড়া আর কেউ না থাকায় তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করি।  আজ পহেলা রমজান। অন্যদিন আমার খাওয়ার জন্য যে সময় লাগে তা আজ লাগেনি। রান্নার পর খাবার গুছিয়ে দিতে যতটুকু সময় লাগে। খাবার নিয়ে কামরুল ভাই’র অফিস হয়ে যাব। ছোট চাচা কামরুল ভাই’র ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছেন। টাকাটা উঠিয়ে হাসপাতালে যাব।  খাবার নিয়ে পায়ে হেঁটে নীলক্ষেত পৌঁছে দেখি নীলক্ষেত থেকে প্রশাসনিক ভবনে যেতে যে রাস্তা পড়ে সেটা বন্ধ। রাস্তার মাঝে পুলিশ ব্যারিকেড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদল শিক্ষার্থী কোটা প্রথা বাতিলের স্লোগান নিয়ে এগিয়ে আসছে।  কি করব বুঝতে পারছিনা। অবস্থা খুব বেশি সুবিধার না। মিছিল পুলিশদের অতিক্রম করতে চাইলে নিশ্চিত গুলি চালাবে। এমন ইতিহাস তো এ বিদ্যাপিঠে কম নেই। দেশ সেরা ছাত্ররা বিভিন্ন সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবে গুলি খেয়ে আসছে। দাদুর এখানেই আফসোস। পান্ডা পুলিশ বুঝতেও পারে না কাদের ওপর তারা গুলি চালায়। তাদের উপর আঙুল উঁচিয়ে কথা বলতে কতটুকু যোগ্যতা লাগে। দাদুর বড় আফসোস। এত কষ্ট করে যুদ্ধ করেও স্বাধীনতা অর্জন বৈষম্য দূর করা গেলনা। স্বাধীনতার আগে পরে একই প্রেক্ষাপট।  মিছিল আরও নিকটবর্তী হচ্ছে। আমরা যারা এই রাস্তার পথচারী এই অবস্থা দেখে নীলক্ষেতের দিকে নিরাপদে আশ্রয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল অতি উৎসাহী হয়ে। আমি এদিককার রাস্তা কোনো রকম চিনি। তারপরও কামরুল ভাই’র অফিসে যাওয়া লাগবে। অগত্যা দাঁড়িয়ে রইলাম।  গতকাল থেকেই কোটা বিরোধী আন্দোলন চলছে। হাসপাতাল থেকেই শুনেছিলাম। আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি শাহবাগ। কিন্তু আজ ক্যাম্পাসে কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। আহা রে! এই ঢাবিতে ভর্তি হব, কত স্বপ্ন ছিল দুচোখে। কিন্তু হতে পারিনি। ওয়েটিং লিস্টের প্রথম দিকে ছিলাম। রেজাল্ট বের হবার পর চেয়ারম্যান চাচা দাদুকে বলেছিলেন, ‘চাচা এমপি সাহেবকে বলে দেখুন কিছু করতে পারে কিনা। আপনারা তো একসাথেই যুদ্ধ করেছেন’। দাদু উত্তরে বলেছিলেন, ‘ দেখো চেয়ারম্যান সন্তানের কোটাই নেইনি, নাতি কোটা কেন নিব? আমরা তো কোটার জন্য যুদ্ধ করিনি। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি শ্রেণী বৈষম্য দূর করতে। আর আজ মহান মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে তার চেতনাকে মুছে দিতে পারিনা’। জবাবে চেয়ারম্যান চাচা বলেন, ‘ অনেকেই তো তা করছে’। দাদুর উত্তর, ‘ জানি। এটাও জানি এমন অনেকেই আছে যারা যুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার সকল সুযোগ গ্রহণ করছে। আমার যতটুকু কর্তব্য-দেশকে স্বাধীন করেছি। দেশের কাছ থেকে আমার কোনো চাওয়া নেই’। দাদুর এই কথার পিঠে আর কোনো কথা চলেনা। তাই আমার আর ঢাবিতে ভর্তি হওয়া হয়নি। পরে যশোর এম এম কলেজে ভর্তি হয়ে সমাজ বিজ্ঞানে পড়ছি।  ছোট চাচার সাথে ব্যবসা দেখাশোনা করতে হয় বলে মেসে থেকে পড়া হয়নি। বাবা মারা যাবার পর বাবা এবং চাচার ব্যাবসা এক সাথে করা ছাড়া উপায় ছিলনা। দুই ব্যবসা একসাথে করে মোটামুটি বড় ব্যবসা হয়। চাচার পক্ষে একা সামাল দেয়া কষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি সাথে থাকি।  বাবা মারা গেছেন দুই বছর হচ্ছে। ঢাকা থেকে ব্যবসায়িক মাল কিনে ফিরছিলেন রাতে। পরদিন সারা দেশে হরতাল ছিল। ঢাকা থেকে বের হওয়ার আগেই পিকেটারদের কবলে পড়ে বাবাদের বাসটি। পিকেটাররা নির্মমভাবে আগুন্ম ধরিয়ে দেয় বাসটিতে। আরো অনেকের সাথে বাবার করুণ মৃত্যু হয়। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা নির্বাক হয়ে যাই। বিনা মেঘে বজ্রপাতেও মানুষকে এতটা দুর্বল করা যায় না। এখনো মনে হলে স্থির থাকতে পারিনা। বাবার লাশ সামনে নিয়ে দাদুর আর্তনাদের স্মৃতি যেন এখনো দুচোখে ভাসে।  দাদুর কান্না ভেজা কন্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল, ‘ দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। বিনিময়ে কিছুই চাইনি। তাই বলে ছেলের লাশ উপহার পাব? কি দোষ ছিল আমার ছেলের? রাজনীতি করে না। কারো কোনো ক্ষতি করেনি। হরতালের সমর্থন অথবা বিরোধীতাও করে না। তাহলে কেন এই পরিণতি?’ দাদুর বুক ভাঙ্গা কান্না সেদিন উপস্থিত সবার চোখে পানি এনে দিয়েছিল। আমার সেই দাদু এখন হাসপাতালে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে। পরিস্থিতি এখন মোটামুটি শান্ত। আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর টিয়ারশেল গ্যাস নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করেছে পুলিশ। তাড়াতাড়ি কামরুল ভাই’র অফিসে পৌঁছাতেই বললেন, ‘এত দেরী হল কেন? চল হাসপাতালে যেতে হবে’। কি হয়েছে জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিলেন না। আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছে জানতে পারি দাদু আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। এখন কেমন চুপচাপ বসে মাকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছি অথচ আমি নিজেই আধা ঘণ্টা আগে কান্নাকাটি করে পরিবেশ অস্থির করে তুলছিলাম। দাদু চলে গেছেন কিন্তু তাঁর আদর্শ আমাকে শোকে শক্ত করে তুলছে -দেশের জন্য সবকিছু দিতে হলেও দিব। কিন্তু তাই বলে বিনিময় নিয়ে নিজের অস্তিত্বকে কলঙ্কিত করতে পারবনা।      (গল্পটি ডাইরি থেকে সংগৃহীত)
আত্মতৃপ্তি_Short Film stories_BD Films Info

ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে বের হয়েছিলাম দশটার পর। ওখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণ নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা। বড় মামার বড় ছেলে কামরুল ভাই এখানে থাকেন। কামরুল ভাই প্রশাসনিক ভবনের সেকশন অফিসার। অফিস থেকে কোনো বাসা পান নি, তাই এখানে ভাড়া থাকেন। দাদুকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে কামরুল ভাই’র বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাই। দাদুর সাথে আমি আর মা এসেছি। আমি বাইরে এলে দাদুর পাশে মা ছাড়া আর কেউ না থাকায় তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করি।
আজ পহেলা রমজান। অন্যদিন আমার খাওয়ার জন্য যে সময় লাগে তা আজ লাগেনি। রান্নার পর খাবার গুছিয়ে দিতে যতটুকু সময় লাগে খাবার নিয়ে কামরুল ভাই’র অফিস হয়ে যাব। ছোট চাচা কামরুল ভাই’র ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছেন। টাকাটা উঠিয়ে হাসপাতালে যাব।
খাবার নিয়ে পায়ে হেঁটে নীলক্ষেত পৌঁছে দেখি নীলক্ষেত থেকে প্রশাসনিক ভবনে যেতে যে রাস্তা পড়ে সেটা বন্ধ। রাস্তার মাঝে পুলিশ ব্যারিকেড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদল শিক্ষার্থী কোটা প্রথা বাতিলের স্লোগান নিয়ে এগিয়ে আসছে।
কি করব বুঝতে পারছিনা। অবস্থা খুব বেশি সুবিধার না। মিছিল পুলিশদের অতিক্রম করতে চাইলে নিশ্চিত গুলি চালাবে। এমন ইতিহাস তো এ বিদ্যাপিঠে কম নেই। দেশ সেরা ছাত্ররা বিভিন্ন সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবে গুলি খেয়ে আসছে। দাদুর এখানেই আফসোস। পান্ডা পুলিশ বুঝতেও পারে না কাদের ওপর তারা গুলি চালায়। তাদের উপর আঙুল উঁচিয়ে কথা বলতে কতটুকু যোগ্যতা লাগে। দাদুর বড় আফসোস। এত কষ্ট করে যুদ্ধ করেও স্বাধীনতা অর্জন বৈষম্য দূর করা গেলনা। স্বাধীনতার আগে পরে একই প্রেক্ষাপট।
মিছিল আরও নিকটবর্তী হচ্ছে। আমরা যারা এই রাস্তার পথচারী এই অবস্থা দেখে নীলক্ষেতের দিকে নিরাপদে আশ্রয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল অতি উৎসাহী হয়ে। আমি এদিককার রাস্তা কোনো রকম চিনি। তারপরও কামরুল ভাই’র অফিসে যাওয়া লাগবে। অগত্যা দাঁড়িয়ে রইলাম।
গতকাল থেকেই কোটা বিরোধী আন্দোলন চলছে। হাসপাতাল থেকেই শুনেছিলাম। আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি শাহবাগ। কিন্তু আজ ক্যাম্পাসে কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। আহা রে! এই ঢাবিতে ভর্তি হব, কত স্বপ্ন ছিল দুচোখে। কিন্তু হতে পারিনি। ওয়েটিং লিস্টের প্রথম দিকে ছিলাম। রেজাল্ট বের হবার পর চেয়ারম্যান চাচা দাদুকে বলেছিলেন, ‘চাচা এমপি সাহেবকে বলে দেখুন কিছু করতে পারে কিনা। আপনারা তো একসাথেই যুদ্ধ করেছেন’। দাদু উত্তরে বলেছিলেন, ‘ দেখো চেয়ারম্যান সন্তানের কোটাই নেইনি, নাতি কোটা কেন নিব? আমরা তো কোটার জন্য যুদ্ধ করিনি। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি শ্রেণী বৈষম্য দূর করতে। আর আজ মহান মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে তার চেতনাকে মুছে দিতে পারিনা’। জবাবে চেয়ারম্যান চাচা বলেন, ‘ অনেকেই তো তা করছে’। দাদুর উত্তর, ‘ জানি। এটাও জানি এমন অনেকেই আছে যারা যুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার সকল সুযোগ গ্রহণ করছে। আমার যতটুকু কর্তব্য-দেশকে স্বাধীন করেছি। দেশের কাছ থেকে আমার কোনো চাওয়া নেই’। দাদুর এই কথার পিঠে আর কোনো কথা চলেনা। তাই আমার আর ঢাবিতে ভর্তি হওয়া হয়নি। পরে যশোর এম এম কলেজে ভর্তি হয়ে সমাজ বিজ্ঞানে পড়ছি।
ছোট চাচার সাথে ব্যবসা দেখাশোনা করতে হয় বলে মেসে থেকে পড়া হয়নি। বাবা মারা যাবার পর বাবা এবং চাচার ব্যাবসা এক সাথে করা ছাড়া উপায় ছিলনা। দুই ব্যবসা একসাথে করে মোটামুটি বড় ব্যবসা হয়। চাচার পক্ষে একা সামাল দেয়া কষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি সাথে থাকি।
বাবা মারা গেছেন দুই বছর হচ্ছে। ঢাকা থেকে ব্যবসায়িক মাল কিনে ফিরছিলেন রাতে। পরদিন সারা দেশে হরতাল ছিল। ঢাকা থেকে বের হওয়ার আগেই পিকেটারদের কবলে পড়ে বাবাদের বাসটি। পিকেটাররা নির্মমভাবে আগুন্ম ধরিয়ে দেয় বাসটিতে। আরো অনেকের সাথে বাবার করুণ মৃত্যু হয়। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা নির্বাক হয়ে যাই। বিনা মেঘে বজ্রপাতেও মানুষকে এতটা দুর্বল করা যায় না। এখনো মনে হলে স্থির থাকতে পারিনা। বাবার লাশ সামনে নিয়ে দাদুর আর্তনাদের স্মৃতি যেন এখনো দুচোখে ভাসে।
দাদুর কান্না ভেজা কন্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল, ‘ দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। বিনিময়ে কিছুই চাইনি। তাই বলে ছেলের লাশ উপহার পাব? কি দোষ ছিল আমার ছেলের? রাজনীতি করে না। কারো কোনো ক্ষতি করেনি। হরতালের সমর্থন অথবা বিরোধীতাও করে না। তাহলে কেন এই পরিণতি?’ দাদুর বুক ভাঙ্গা কান্না সেদিন উপস্থিত সবার চোখে পানি এনে দিয়েছিল। আমার সেই দাদু এখন হাসপাতালে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে। পরিস্থিতি এখন মোটামুটি শান্ত। আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর টিয়ারশেল গ্যাস নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করেছে পুলিশ। তাড়াতাড়ি কামরুল ভাই’র অফিসে পৌঁছাতেই বললেন, ‘এত দেরী হল কেন? চল হাসপাতালে যেতে হবে’। কি হয়েছে জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিলেন না। আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছে জানতে পারি দাদু আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। এখন কেমন চুপচাপ বসে মাকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছি অথচ আমি নিজেই আধা ঘণ্টা আগে কান্নাকাটি করে পরিবেশ অস্থির করে তুলছিলাম। দাদু চলে গেছেন কিন্তু তাঁর আদর্শ আমাকে শোকে শক্ত করে তুলছে -দেশের জন্য সবকিছু দিতে হলেও দিব। কিন্তু তাই বলে বিনিময় নিয়ে নিজের অস্তিত্বকে কলঙ্কিত করতে পারবনা।


(গল্পটি ডাইরি থেকে সংগৃহীত) 

SHARE THIS

0 comments:

Write a comment